আবুল খায়ের: কেউ প্রিয়জনকে উপহার প্রদানের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন এবং খুঁজে পান অপরিসীম প্রাণের আবেগ। আবার কেউ উপহার গ্রহণ করার মাঝে খুঁজে পান প্রচন্ড ঊচ্ছাস ও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস। আর প্রাণের আবেগ ও আত্মবিশ্বাসকে মানুষ বহন করে চলেছে বহুকাল থেকে। যা আজো সক্রিয় আছে যুবক যুবতীদের মাঝে অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তবে সেটার প্রকাশভঙ্গি আর আগের মতো বর্তমান নেই।

এক সময় শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি সুন্দর মাধ্যম ছিল পোষ্ট কার্ড’। ঈদ আসলেই প্রিয়জন-কে উপহার হিসেবে পোস্ট কার্ড পাঠানো একটি প্রচলিত রেওয়াজ ছিল। যেটা অনেক পুরাতন পদ্ধতিও বটে। পোস্ট কার্ড হাতে আসলে কতো যে আনন্দের বন্যা ও অনুভূতির ব্যাপার ছিল, তা বলে শেষ করা যাবে না। পোস্ট কার্ডে এক পিঠে প্রাপক ও প্রেরকের নাম-ঠিকানা লেখার সুযোগ ছিল। প্রেরক চাইলে প্রাপককে নিজের মনের কথা/ঈদ শুভেচ্ছা লিখে (খুবই সংক্ষেপে-এক থেকে দুই লাইন-এর মধ্যে) জানাতে পারতেন। অন্য পিঠে ভালোবাসার আহবান-ফুল অথবা ছবি অংকিত কিছু কথা/কবিতার লাইন অথবা ছন্দ ইত্যাদি লেখা থাকতো। ঈদের সময় পোষ্ট কার্ড কিনতে পাওয়া যেতো প্রায় সকল শপিংমল। দামও ছিল কম, এক-দুই টাকা। কালে ভদ্রে বিলীন হতে হতে এখন আর পোস্ট কার্ড দেখা যায় না। যাদু ঘরেও (মিউজিয়ামে) পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। অনেকে পোষ্ট কার্ড সংগ্রহ করা ও তা সংরক্ষণ করার মাঝে খুঁজে পেতেন অনেক গৌরবের ইতিহাস।

পোস্ট কার্ডের যুগ শেষে আসলো ঈদ কার্ড বিনিময়। নানা রকমের ঈদ কার্ড বাজারে কিনতে পাওয়া যেতো। দামও ছিল খুবই কম, তবে বেশ ব্যবহুল কার্ডও পাওয়া যেতো-যেগুলি খুলতেই সুরেলা মিউজিক বা কোন জনপ্রিয় গান বাজতো। বিচিত্র রকমের ও আকৃতির ঈদ কার্ডে ছন্দ, কবিতার লাইন/ভালোবাসার আকুতি প্রকাশ করা কারুকাজ অথবা লেখা, ছবি, ফুলের কলি অংকিত ছবি/ভাব প্রকাশের সুযোগ থাকতো। কেউ নিজের হাতে তৈরী করা ঈদ কার্ড উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে সারপ্রাইজ দিতেন। ঈদ আসলেই ঈদ কার্ডের জন্য আলাদা দোকান-এর পসরা দিয়ে বসতো কিছু কার্ড ব্যবসায়ী। নাম করা কিছু ব্রান্ডও ছিল কার্ডের, যেমন-আজাদ প্রোডাক্টস, আইডিয়েল প্রোডাক্টস, আর্চেস গ্যালারী ইত্যাদি। কার্ড নির্বাচন করা ছিল একটি কঠিন কাজ। কয়েদিন বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে তবেই পাওয়া যেতো পছন্দের কার্ড। অবশ্য স্টেশনারী/মুদি দোকানেও পাওয়া যেতো ঈদ কার্ড। কিছু মৌসুমী কার্ড বিক্রেতাকে দেখা যেতো গলির মাথায়, রাস্তার মোড়ে, পথে-ঘাটে কার্ডের প্রদর্শনী দিয়ে ক্রেতাদেরকে আর্কষণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা লক্ষ্য করা যেতো। তবে এখন আর সেইরকম দেখা মেলে না কার্ড ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে ঈদ কার্ড পাওয়া গেলেও তা অতি বিরলও বটে; আগের মতো সহজলভ্য নয় এবং নেই আগের মতো জনপ্রিয়তা, তবে হৃদয়ের আকুতি ও মনের ভাব প্রকাশের চাহিদা একটুও কমেনি।

অতঃপর ‘পোস্ট কার্ড’ ‘ঈদ কার্ডের’ জায়গা দখল করলো ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস), মধ্যম ক্ষুদে বার্তা (এমএমএস) বা ছবিসহ ক্ষুদে বার্তা। তবে ছবিসহ ক্ষুদে বার্তায় খরচ একটু বেশী ছিল বলে ততোটা ব্যাপকতা ছিলনা। ঈদের আগের রাত থেকে মোবাইল বা মুঠো ফোন-এ ক্ষুদে বার্তা/মধ্যম ক্ষুদে বার্তা আসতে থাকতো, তা ঈদের দিন এমনকি পরের দিনও চালু থাকতো। মোবাইল কোম্পানীগুলি ক্ষুদে বার্তার জন্য নানা রকমের প্যাকেজ সুবিধা দিতো। তা এখনো চালু আছে। তবে আগের মতো অতটা আগ্রহ নেই মানুষের; অনেকটা ভাটা পড়েছে চাহিদার কোন এক অজানা কারণে হয়তোবা সময়ের বিবর্তনে।

বর্তমানে ফেইসবুক/টুইটার-এর যুগে-আর টাকা খরচ ও সময় নস্ট করে ঈদ কার্ড’ পাঠানোর মানসিকতা কয়জনের আছে? ডিজিটাল কার্ড পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের এনিমেটেড’সহ। দেখতেও খুবই ভালো লাগে। এছাড়াও টাইম লাইনে দুই-চারটা কবিতার লাইন অথবা স্বরচিত কিছু লেখা দিয়ে প্রিয়জনকে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। নিজস্ব স্বকিয়তা ও রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় টুইটার/ফেইসবুক-এর টাইম লাইন ভিজিট করলে। তবে মেসেঞ্জার-এর মাধ্যমেও শুভেচ্ছা বিনিয়ময়’সহ যাবতীয় আলাপ করা যাচ্ছে প্রিয়জনদের সাথে হরহামেশায়। স্মরণীয় কোন মূহর্তের ছবি, ভিডিও বিনিময় করার সুযোগতো বেশ কাজে লাগাচ্ছেন কিছু রুচিশীল ব্যবহারকারী। প্রিয়জনকে চমকে দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার চেষ্টারত আছেন কিছু নতুন জেনারেশন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও দাওয়াত প্রদানে আসছে বৈচিত্রতাও। দিন দিন নতুন নতুন ধারণা’সহ চলে যাচ্ছে ব্যবহারকারীর ইনবক্সে/টাইম লাইনে। এতে সময়ের অবচয় যেমন কমেছে, তেমনি ব্যবহারও বেড়েছে উল্লেযোগ্যহারে।

পরিশেষে পোষ্ট কার্ড, ঈদ কার্ডে-এর কদর এখনও আছে অমলিন। কথায় বলে-পুরাতনই স্বর্ন। হৃদয়ের ব্যাকুলতা প্রকাশের ডিজিটাল যতো মাধ্যমই আবিস্কার হোক না কেন, পুরাতন মাধ্যম এখনও অটুট তাদের মনের মনিকোঠায় যারা-এর সফল ব্যবহার করেছিলেন অথবা সুবিধা নিয়েছিলেন। স্মৃতিময়-গীতিময় ছিল যাদের যৌবন, তারা কী করে ভুলে থাকবেন প্রিয়সীর সেই হাতের লেখা অথবা কারুকার্য খচিত কার্ড। অনেকে এখনও জীবনের প্রথম পাওয়া কার্ড খুবই যত্ন করে রেখে দিয়েছেন-সুটকেসে বা আলমিরার কোন এক প্রকোষ্ঠে অথবা ডায়েরীর শেষ পাতায়, যুগের পর যুগ ধারন ও বহন করে চলেছেন সেই প্রিয়জনের উপহার। মাঝে মধ্যে বের করে স্মৃতির পাতায় ঢুব-সাঁতার কাটার চেষ্টা করেন। তলিয়ে যাওয়ার পথ থেকে উত্তরণের চেষ্টাও করেন। কেউ ভুলে থাকার ব্যর্থ চেষ্টাও করেন। কিন্তু স্মৃতি কী ভুলে থাকা যায়?

লেখকঃ কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী