জে,জাহেদ চট্টগ্রাম: ঘড়ির কাটায় ঠিক কটা বাজে এই মুহুর্তে জানা নেই। ইদানিং ঘড়িটা বের করা হয় না। একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে কাঁক ভেজা বৃষ্টিতে আমি তখন বাসযাত্রী। বাস ছুটে চলেছে আমার লক্ষ্য গন্তব্যে। বাসে বসেই প্রত্যক্ষ করছি জনবিচ্ছিন্ন নগরীতে সমন্বয়হীন স্বার্থের উন্নয়ন। দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা সুর্যের দেখা মেলেনি।অবশেষে চট্টগ্রামে শেষ বেলায় মিলল সূর্যের দেখা!

সূর্যের দেখা মিললেও আকাশে জমে আছে ঘন মেঘ। ভারি বৃষ্টিতে নগরী এখন অনেকটাই অচল প্রায়। ওয়াসা, সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়হীন খোঁড়াখুড়িতে নগরী জুড়ে খানাখন্দে ভরা। প্রত্যক্ষ করছি এই রমজানে জনগনের চরমভোগান্তি। সমগ্র নগর জুড়ে দেখা মিলে উন্নয়নের সাইনবোর্ড এবং তাতে লেখা “রাস্তার উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলিতেছে”।

মাত্র দু’দিনের বৃষ্টিতে বন্দর নগরী যেন ভোগান্তির শহর। ঘর থেকে কোথাও বের হবার সুযোগ নেই। সিডিএ,ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশন এর অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও সংস্কারের ফাঁদে জনগণ।

বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে নগরীর নিচু এলাকা এখন পুকুরে পরিণত। নগরীর দেওয়ানহাট যেতেই সামনে বায়তুশ শরফ চৌরাস্তার মোড়। একটু এগিয়ে যেতেই কানে বাজে বাসের হেলপারের হাঁক ডাক—

ওস্তাদ ব্রেক, সামনে পুকুর! 

chattogram-city-area

নগরীর দেওয়ান হাট সিটি কর্পোরেশন মার্কেট এলাকা

বাসের যাত্রীরা হতভম্ব। হতচকিত যাত্রীরা ভাবে নগরীর মাঝখানে আবার পুকুর কোথায়! খানিক পরে জানালা দিয়ে তাকাতেই সামনে দেখা মিলল বৃষ্টির পানিতে ভরা পুকুর! সারাদিনের বৃষ্টিতে সড়কের উপর সদ্যই নির্মিত পুকুরের কোন দিকে গর্ত কে জানে। বাসের ড্রাইভার কষে ব্রেক চাপলেন। আচমকা ব্রেক কষায় যাত্রীরা একে অন্যের ঘাড়ে হুমড়ে পড়লো। বাসের পেছন দিক থেকে কে যেন নিজের ভাগ্যকেই গালি দিল। এটাই হচ্ছে নগরীর বাসে যাতায়াত করা যাত্রীদের নিত্যদিনের খন্ডচিত্র।

ফি বছর বর্ষার ঠিক আগেই সড়কের সংস্কার কাজ করা এখন নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। হাজারো লেখালেখি ও সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের এই ধারাবাহিকতা থেকে কেউ যেন বের হয়ে আসতে পারছেন না। এ যেন জনবিচ্ছিন্ন নগরীতে সমন্বয়হীন স্বার্থের উন্নয়ন চলছে!

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা সুজিত কান্তি রায় মুঠোফোনে জানান, শুক্রবার রাত থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। আগামী মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রামে কখনও মুষলধারে, আবার কখনও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত নগরী। চলাচলে মানুষের জীবনে যেন নেমে এসেছে দীর্ঘশ্বাস।

নগরীর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, সদরঘাট,বাকলিয়া, চকবাজার, বাদুরতলা, আগ্রাবাদসহ বেশিরভাগ নিম্নাঞ্চল হাঁটুপানিতে ডুবে গেছে।

আগ্রাবাদের বাসিন্দা বাসযাত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের একেবারে শেষ এবং নিম্নাংশে মুহুরীপাড়া, গুলবাগ, দাইয়াপাড়া ও উত্তর আবাসিক এলাকা। এসব এলাকা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্রতিনিয়ত জলমগ্ন থাকে। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, সিডিএ আবাসিক এলাকাও মহেষখালের জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। এতে এলাকাবাসীর দুর্বিষহ কষ্ট বর্ষাকালজুড়ে লেগেই আছে।

জনগণের কথা ভাবার যেন কেউ নেই!

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা সুজিত কান্তি ধর বলেন, ‘বৈশাখের শেষে বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। তবে টানা বৃষ্টিটা অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে হচ্ছে। এ বৃষ্টিপাত আরও দু-একদিন থাকতে পারে।’

বর্ষা মৌসুম এখনো আসেনি। এখনই যদি নগরীর এ হাল হয়! ভরা মৌসুমে নগরবাসীর ভোগান্তির কথা ভেবে শিউরে উঠে মন। এদিকে আগ্রাবাদ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র আ,জ, ম নাছির উদ্দীনকে পাঁচ দফা দাবি-সম্বলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে এলাকাবাসী।

চিঠিপত্র ,অভিযোগ আর নানা আশা ভরসায় নগরীর মানুষ স্বপ্ন দেখে। বাস এসে থামে নিজের গন্তব্যে। যাত্রীরা সব একে একে যে যার মতো ঘরে ফেরে। কিন্তু পরিচ্ছন্ন এক নগরীর স্বপ্ন কখনো যেন পুরণ হবার নয়।