অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-১, জে, জাহেদ: চট্টগ্রাম মহানগরে পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে ।কার্যত: দেখার যেন কেউ নেই! অসহায় হয়ে পড়েছে সাধারন যাত্রীরা।ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পরিবহন ব্যবসায় নিয়োজিত মালিক-শ্রমিক এবং শেষ পর্যন্ত সব বোঝার ভার বইতে হচ্ছে সাধারন জনগনকে অর্থাৎ সাধারন যাত্রীদের!

সকাল সন্ধ্যা চট্টগ্রাম মহানগরীর ব্যস্ততম এলাকা বহদ্দার হাট,দেওয়ান হাট, বাদামতলী, বড়পুল, নয়াবাজার, অলংকার, কর্ণেল হাট, জিএসি, নিউমার্কেট,আমতল ,জামালখান,এসব এলাকায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকেও গন্তব্যে পৌছার জন্য কোন গাড়ী পাচ্ছেন না সাধারন যাত্রীরা। দৃশ্যত: মনে হচ্ছে জনগনের কোন প্রতিনিধি নেই!

যাত্রী সাধারনের সমস্যা হচ্ছে বলে স্বীকারও করলেন চট্টগ্রাম সিটি যাত্রী কল্যান সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক মো: নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমি চট্টগ্রাম মহানগরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি,অনুরোধ করছি সকাল-বিকাল নগরীর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে একটু অবস্থান করুন।দেখুন জনগন কিভাবে কষ্ট পাচ্ছে! সামনে রমজান যেভাবে চলছে তা ঠিক নয়!! জনগন এই অচলাবস্থা কোনভাবেই বেশীদিন মেনে নেবে না।

রাস্তায় রাস্তায় মোড়ে মোড়ে অফিস,স্কুল, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ঘরে ফেরত সাধারন যাত্রীরা পরিবহন সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে! এ বিষয়ে মোবাইলে কথা হয় বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, আকবর শাহ থানার সাধারন সম্পাদক কাজী আলতাফ হোসেন এর সাথে। তিনি বলেন,“ বিবদমান দু’টি শ্রমিক সংগঠনের কারনে চট্টগ্রাম মহানগরে পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ জনবান্ধব কাজকে অগ্রাধিকার দেয়। জনগণের সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি। সাধারন জনগণকে জিম্মি করে কোন রাজনীতি নয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় জনসাধারনকে ভোগান্তিতে ফেলা যাবে না। রমজানের আগেই এই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি চট্গ্রাম নগরীর অভিভাবক সিটি মেয়র আলহাজ্ব আ,জ,ম নাছির উদ্দিনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

gonogon-paribahan

একটি অটোটেম্পো আসার সাথে সাথে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি (ছবি: দেওয়ান হাট মোড় থেকে)

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রাথমিক স্কুলে কর্মরত জনৈক শিক্ষিকা বলেন, দৈনন্দিন কাজে সকাল বেলা পানির কল থেকে দেওয়ান হাট পর্যন্ত যাতায়াত করতে হয়।আগে  ৫/১০ মিনিট দাড়ালেই পানির কল থেকে টেম্পো পেতাম কিন্তু গত দু’মাস থেকে কোনভাবেই গাড়ী পাচ্ছি না।বিকালে স্কুল শেষে দেওয়ান হাট থেকেও ইদানিং টেম্পো পাচ্ছি না।ক্ষেত্র বিশেষে দু’এক ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়। আমরা মেয়ে মানুষ সবার সাথে দৌড়াদৌড়ি-হুড়াহুড়ি করে, মহিলাদের পক্ষে টেম্পোতে উঠা সম্ভব হয় না। কয়েক বার চেষ্টা করেও দেখেছি কিন্তু সফল হতে পারিনি। তাছাড়া কিছু দুষ্টু প্রকৃতির লোকজন আছে মহিলাদের স্পর্ষকাতর অঙ্গে স্পর্ষ করে বসে।বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কি করবো? কাকে বলবো? জনগনের কথা ভাবার কেউতো নেই! সবাই রাজনীতিটা কিন্তু জনগনের জন্যেই করেন!

কোচিং ফেরত মিথিলা ক্ষোভের সহিত বলে, দেওয়ানহাট থেকে নয়াবাজার বাসায় ফিরতেই ২/৩ ঘন্টা লেগে যায়।আগে এই সমস্যা ছিল না। বাসায় মা-বাবা চিন্তা করে। পড়াশুনার সময়টা নষ্ট হয়।চট্টগ্রাম শহরে কি এটা দেখার কেউ নেই? কি করবো, কাকে বলবো? ভেবে পাই না। কিছুই করার নেই আমাদের। আমাদের সমস্যা নিয়ে ভাবার যেন কেউ নেই! সব কিছু যদি প্রাইমমিনিষ্টারকে ভাবতে হয়, দেখতে হয়, তবে এত এত নেতা-নেত্রী চট্টগ্রামে কেন?

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআরটিএ ও চট্টগ্রাম মহানগরের যানবাহন নিয়ন্ত্রনে গঠিত আরটিসি(রুরাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি) কর্তৃক অনুমোদিত রুট ১৭টি।১নং রুট বারিক বিল্ডিং টু চকবাজার, ২নং রুট বায়েজিদ- ষোল শহর-টাইগারপাস, ৩নং রুট হালিশহর টু নিউমার্কেট,৪নং রুট কালুরঘাট টু কোতয়ালী মোড়, ৫নং রুট আমতলা টু বহদ্দার হাট-কালুরঘাট, ৬নং রুট সিটি গেইট টু ছোটপুল-দেওয়ানহাট, ৭নং রুট কর্ণফূলী ব্রীজ টু কালামিয়া বাজার-বহদ্দার হাট,৮নং রুট চাঁন্দগাও আবাসিক টু কানুনগোপাড়া, ১০নং রুট অলংকার টু কদমতলী, ১১নং রুট জিইসি টু কর্ণেলহাট, ১২নং রুট বিটাক টু বিআরটিসি, ১৩নং রুট কর্ণেল হাট টু নিমতলা,১৪নং রুট বহদ্দার হাট টু মদুনাঘাট, ১৫নং রুট মুরাদপুর টু কোতয়ালী মোড়,১৬নং রুট ফতেয়াবাদ টু ২নং গেইট- চট্টগ্রাম মেডিকেল,১৭ নং রুট নিউমার্কেট টু শাহ আমানত ব্রীজ নিয়ন্ত্রন করে এক একটি শ্রমিক সংগঠন। মুলত: জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম মহানগরে সিএনজি অটোটেম্পো চলাচলের জন্য সরকার তথা আরটিসি উপরোক্ত রুট সমূহের অনুমোদন দেয়।চট্টগ্রাম মহানগরে সাধারন জনগনের আভ্যন্তরীন যাতায়াত সহজ করতেই আরটিসি কর্তৃক এই রুটগুলোর বিন্যাস করা হয়েছে।

অথচ চট্টগ্রাম মহানগরের এই রুট সমূহে চলছে নিয়ন্ত্রনহীন চাঁদাবাজী।আর ঘুরে ফিরে এই চাঁদাবাজীতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারন যাত্রীরা।চট্টগ্রাম মহানগরে হাতে গোনা কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনই মুলত নিয়ন্ত্রন করে এই রুটগুলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই রুটগুলোর উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শ্রমিক সংগঠনসমূহ পারস্পরিক দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ে।কারন এক একটি রুটের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই লক্ষ লক্ষ টাকার হাতছানি।দৈনিক এক একটি রুটে গাড়ি প্রতি ২০০ হতে ৩০০ টাকার মতো লাইন চাঁদা, কল্যান চাঁদার নামে উত্তোলন করা হয়।এক একটি রুটে গাড়ী ভর্তি বানিজ্যে গাড়ী প্রতি পাঁচ হাজার টাকা হতে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তি ফি নেয়া হচ্ছে। চাঁদার টাকায় কেউ কেউ ইতিমধ্যে সাধারন সিএনজি চালক ও শ্রমিক নেতা থেকে হয়ে উঠেছেন কোটি টাকার মালিক।

এ সম্পর্কিত দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার শিরোনাম (২৫ আগষ্ট ২০১৫) অফিস পিয়ন থেকে পরিবহন নেতা হারুন অটোরিক্সার নাম্বার প্লেট বেচে মাসে কোটি টাকার চাঁদাবাজিদৈনিক আজকালের খবর শিরোনাম (২১ ডিসেম্বর ২০১৭) করে চাক্তাই সড়কে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ টেম্পো চালকরা দৈনিক খবর (৩০ অক্টোবর ২০১৪) শিরোনাম করে চট্টগ্রাম লালদিঘী টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদাবাজি দৈনিক সাঙ্গু শিরোনাম (২১ ডিসেম্বর ২০১৭) করে পুলিশ কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা চাক্তাই সড়কে জানে আলম-বাবুল গ্রুপের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ টেম্পু চালকরা দৈনিক আজাদী শিরোনাম (২১ জানুয়ারী ২০১৮) করে মারধরের পর এবার কারাগারে পাঠানো হলো চালকদের দৈনিক আজাদী (২৮ জানুয়ারী ২০১৮) শিরোনাম করে চাঁদা না দেয়ায় আগ্রাবাদে টেম্পো চালকদের মারধর, আহত ২০ বড়পোল-দেওয়ানহাট সড়কে কয়েকঘন্টা টেম্পো চলাচল বন্ধ,দুর্ভোগ

প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ২৬ ডিসেম্বর ১৩নং রুটের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাংলাদেশ অটোটেম্পো শ্রমিক লীগ রেজি নং ১৪৬৯ ও চট্টগ্রাম সীতাকুন্ডু অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়ন রেজি:নং ১২৯২ সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে এবং বেশ ক’জন শ্রমিক নেতা গুলিবিদ্ধ, ছুরিকাহত হয়। এই নিয়ে বিবদমান গ্রুপগুলো একে অন্যের নামে মামলা করে।হালিশহর থানায় মামলা নং ২০/২০১৮ রুজু করা হয়  ।শ্রমিক সংগঠনের অপর পক্ষও কোর্টে মামলা করে।মুলত:এক একটি রুটে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নামে-বেনামে এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরে একাধিক অভিযোগ করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাম ও প্যাড সর্বস্ব এসব শ্রমিক সংগঠনে(রেজি: নং- ১৩০৯, ১৪৪১, ১২৯২, ১৪৮৭,১৪৮৩,১৪৬৯) নিয়মিত নির্বাহী কমিটির মিটিং,সাধারন সভা, আয়-ব্যয়ের কোন হিসাব পাওয়া যায়না।নিয়মিত কোন অডিট হয় না।গঠনতন্ত্রের নিয়ম থাকলেও কোন নির্বাচন হয় না। শ্রমিক সংগঠনের সাধারন সদস্যরা এসব সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে রেজিষ্টার অব ট্রেড ইউনিয়নস, চট্টগ্রাম বরাবরে একাধিক অভিযোগ করলেও সরকারের এই দপ্তর হতে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।সাধারন শ্রমিকদের স্বার্থ ও দাবী-দাওয়া আদায়ে এসব শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হলেও বাস্তবে এসব শ্রমিক সংগঠনের স্বঘোষিত নেতারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় লিপ্ত থেকে আয়েশী জীবন-যাপন করছে।

মাঠ পর্যায়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে একটি শ্রমিক সংগঠন সর্বশেষ গত ৬ ফেব্রুয়ারী মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিটে(১০৬৭/২০১৮) চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় রুট পারমিটবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন করা হয়। ১৯৮৩ সনের রুট পারমিট আইন অনুসারে প্রথমে একটি গাড়ী রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়া, ফিটনেট সার্টিফিকেট ফি ও সরকারের প্রয়োজনীয় ট্যাক্স প্রদান করে রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার গ্রহন করে বিআরটিএ কর্তৃক আরটিসি(রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি) বরাবরে আবেদন করতে হয়।প্রয়োজনীয় সিলিং(চাহিদা) যাচাই-বাছাই করে আরটিসি রুট পারমিটের অনুমোদন দেয় এবং রাস্তায় গাড়ি চলাচল করে।

gonogon-paribahan1

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অটো টেম্পো এলেও সীট খালি নেই! (ছবি: দেওয়ান হাট মোড়ের)

“আরটিসি অনুমোদন দিলেও চট্টগ্রাম মহানগরের ১৭টি রুটের অলিখিত মালিক এই শ্রমিক সংগঠনগুলো।প্রতি মাসে চট্টগ্রাম নগরীর এই রুটগুলোতে চলে কোটি টাকার চাঁদাবাজী ও ভর্তি বানিজ্য। বংশ পরম্পরায় এই চাঁদা বানিজ্যে জড়িত শ্রমিক সংগঠনের একাধিক নেতা।নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে প্রশাসনের নাকের ডগায় যুগ যুগ ধরে এই বানিজ্যের প্রসার ঘটে আসলেও সরকারের আইন প্রয়োগকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে মনে হচ্ছে নগরীতে সাধারন জনগনের অভিভাবক বলতে কেউ যেন নেই”-ক্ষোভের সহিত কথাগুলো বলছিলেন সিএনজি ও অটোটেম্পো মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব এম. এ ফারুক

উদ্ভুত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রন ও সমস্যার সমাধানে চট্টগ্রাম নগরীর অভিভাবক মাননীয় মেয়র মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারন জনগন ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

(চলবে….)