সম্পাদনা বিভাগ, ফোকাস বাংলা।টিভি : হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ আজকের এইদিনে ” বঙ্গবন্ধু ” উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু কিভাবে পেলেন এই বঙ্গবন্ধু উপাধি। আমাদের আগত ভবিষ্যত নতুন প্রজন্মকে তা জানতে হবে।

এবার মাঝপথ থেকেই শুরু করি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিডিং ক্লাবের ১২৯ তম পাবলিক লেকচার থেকে কিছু উদ্বৃতির এখানে দিতে চাই,

“বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক চোরাগলিতে প্রবেশ করা যাবে, রাজনীতির অনেক ফাঁক-ফোকর নিয়ে ভালো একটা বুঝ আসবে।”

“বঙ্গবন্ধু যেমন অনেক বিশাল গুণের সমাহার আবার তাঁর মধ্যে এমন কিছু দূর্বলতা ছিল যা তার ট্র্যাজিক পরিণতির দিকে তাঁকে নিয়ে যায়।”

“বঙ্গবন্ধু একদিকে আশার নাম আবার অন্যদিকে অপূর্ণতা, অতৃপ্তির নাম।”

“বঙ্গবন্ধু কখনোই অপ্রাসঙ্গিক ছিলেন না এবং তাকে অপ্রাসঙ্গিক করা অসম্ভব। বিশেষ করে আমাদের মত তরুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু সবসময়ই একটি অনুপ্রেরনার নাম।  আমাদের চরম হতাশার মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর চরম সংগ্রাম শীলতার মধ্য থেকে আমরা অনুপ্রেরনা নিতে পারি। একজন ব্যক্তির সাথে কিভাবে একটি জাতির পুরো আবেগ, স্বপ্ন, জাগরণ, মুক্তি, ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকতে পারে বঙ্গবন্ধু তার সার্থক উদাহরণ। একটি জাতির জাতীয়তাবোধের জাগরণের শৈশব যখন ছিল তখন একটি ব্যক্তির শৈশব। তার যৌবনে জাতিটি যৌবনে পদার্পন করে। ব্যক্তিটি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন তখন জাতিটি ও প্রাপ্তবয়সে পৌছে। এমন স্তরে দুপক্ষ পৌঁছে যায় যে পুরো জাতি তার স্বাধীনতার জন্য কাঙ্গাল হয়ে যায় এবং ব্যক্তিটি সেই স্বাধীনতার মহানায়ক হয়ে যায়।”

কিন্তু কিভাবে পেলেন এই বঙ্গবন্ধু উপাধি?

বৃটিশ-ভারত ও পাকিস্তান শাসনামলে দেশ বরেণ্য নেতাদের নামের পাশে বিশেষ উপাধিতে ভুষিত করার প্রয়াস শুরু হয়। যেমন ‘ বাংলার বাঘ’,শেরেবাংলা’, ‘কায়েদে আজম’ বা ‘কায়েদে মিল্লাত’। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে যে সম্মাননার নামে ভূষিত করা হলো সে বঙ্গবন্ধু নামের জন্ম বাংলা ভাষায়। চিত্তরঞ্জন দাশকে ‘দেশবন্ধু’ অভিধায় সম্মানিত করার নজির থাকলেও পদ্মা-যমুনা-মেঘনার দেশের নেতাকে সেই দেশের ভাষায় সম্মাননায় ভূষিত করার বিষয়টি একটি তাৎপর্যপূর্ন পরিবর্তন।

বাংলায় বঙ্গবন্ধু শব্দটি তাৎপর্যবহ । বাংলা ভাষাগত জাতীয়তার মাধ্যমে যে একটি জাতি একত্রিত হচ্ছে তার একটি প্রমান এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনা।

২৩ ফেব্রæয়ারী ১৯৬৯ বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু, বেওয়ালফ্, আগামেমনন ও ওডিসি

মুজিবের সাথে বেওয়ালফ্ এর অনেক মিল আছে। অত বড় হিরো কত বড় প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করে দেশকে উদ্ধার করলও, জনগণের নায়ক হলো। আবার প্রবল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্বল সময়ে লড়াই করতে গিয়ে প্রান হারালো!

‘বেওয়ালফ’ হচ্ছে অ্যাংলো স্যাক্সন মহাকাব্য। এটা ইংরেজির আদিতম নিদর্শন। তবে এটা কে বা কারা লিখেছেন এটা জানা যায়নি। বেওয়ালফ এর মূল চরিত্র, প্রধান নায়ক মহাকাব্যের মহাকাব্যিক চরিত্র বেওয়ালফ্ নিজে। বেওয়ালফ্ হচ্ছেন এক মহান নায়ক।

অ্যাংলো স্যাক্সন বীর বেওয়ালফ্ তার প্রতিবেশী দেশ বর্তমান ডেনমার্ক এর রাজা রথগারকে উদ্ধার করতে যান। রথগারের রাজ্যে গ্রেনডাল নামে এক দানব রাতে হানা দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতো। এজন্য সে রাজ্যের মানুষ ও রাজা ছিল অসুখী। বেওয়ালফ্ গ্রেনডালকে খালি হাতে প্রতিহত করেন এবং গ্রেনডালের একটি একটি হাত বা কয়েকটি হাত ছিড়ে ফেলেন। গ্রেনডেল দানব প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে এবং গিয়ে তার আবাসস্থল পার্শ্ববর্তী জলায় আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে গ্রেনডেলের মা আরেক ডাইনী ছেলের প্রতিশোধ নিতে আসে এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে, রাজার প্রধান উপদেষ্টাকে হত্যা করে। বেওয়ালফের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং ডাইনীর পেছনে দাওয়া করে তার আবাসস্থল জলাবদ্ধ জায়গায় চলে আসে। সেখানে বেওয়ালফ একা প্রবেশ করে এবং ডাইনীকে মেরে আসে। আসার পথে তার ছেলে আহত গ্রেনডেলের দেখা পায়। সে গ্রেনডেলের মাথা কেটে নিয়ে আসে। এটা রথগারের রাজ্যে খুশির বান নিয়ে আসে। রাজা রথগার একবার বেওয়ালফের বাবাকে কোন এক বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। বেওয়ালফ্ তার বাবার বন্ধুর রাজ্যকে উদ্ধার করে দিয়ে যান। বৃদ্ধ রাজা রথগার বেওয়ালফকে রাজা ঘোষণা করে মারা যান।

রথগারের মৃত্যুর পর প্রায় ৫০ বছর বীর বেওয়ালফ দেশের মানুষকে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। ৫০ বছর শান্তিপূর্ন শাসনের পর নতুন করে আরেক দানব হানা দেয়। বেওয়ালফের কোন বীর যোদ্ধা তার সাথে পেরে উঠতে পারছিল না। অনেক দেশবাসী এবং বীরযোদ্ধা ঐ দানবের সামনে নিহত হয়। শেষে বীর বেওয়ালফ্ নিজেই দানবের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সিদ্বান্ত নেয়। বন্ধু বান্ধব, পরিবার, উপদেষ্টা এবং দেশবাসীর অনুরোধ উপেক্ষা করে যুদ্ধে নামে বেওয়ালফ্। বেওয়ালফের মানসিক শক্তি আগের মতই ছিল কিন্তু সে যে তার সেরা সময় ৫০ বছর আগেই পেরিয়ে এসেছিলো। বীর বেওয়ালফ্ এক মরনঘাতী যুদ্ধে ঐ দানবকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয় কিন্তু এটা করতে গিয়ে নিজেও দানবের হামলায় মারাত্মক আহত হয় এবং তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করলো বুড়ো বীর বেওয়ালফ্।

বেওয়ালফ্ এর এই ট্রাজিক পরিণতি দেশবাসীর জন্য এতই দু:খের ছিল যে তারা কয়েকবছর টানা বীর বেওয়ালফের জন্য শোক প্রকাশ করে যাচ্ছিল এবং নারীরা বিলাপ করে যচ্ছিল। বেওয়ালফের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য সমুদ্র পাড়ের কাছাকাছি সবচেয়ে বড়, লম্বা ও উঁচু সমাধিসৌধ বানানো হয় যেটা অনেক দূর থেকেও দেখা যেতো। দেশের মানুষের কাছে সে স্মৃতি আরও দীর্ঘ ও লম্বা ছিল।

আমরা মুজিবকে যদি দেখি তাহলে দেখবো ৪৬ বছর বয়সে ৬ দফা দাবির ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক দানবদের হাত কেঁটে নিয়েছিল। এবং ৬৯ ও ৭১ দানবদের মা (আইয়ুব খান) ও ছেলেকে (ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও সামরিক জান্তা) নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল এবং একটি স্বাধীন দেশের বীরপুরুষ, মহান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

তারপর কিছু সুসময়——–,আবার দু:সময়, প্রবল প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে ট্রাজিকভাবে নিহত হন। এ সব কিছুই মুজিবকে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র, ট্রাজিক হিরো বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের আরও অনেক বড় নেতা ছিলেন। সবাইকে নিয়েই কম বেশি আলোচনা হয় কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক বেশিই আলোচনা হয়। তার স্মৃতি মানুষের মনে অনেক চাঙ্গা। মহাবীর বেওয়ালফের মত মুজিবের স্মৃতির মিনার অনেক উঁচু, লম্বা ও চওড়া!

আবার আরেক দিক দিয়ে সে গ্রীক রাজা আগামেমননের মতো। পুরো গ্রীককে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব লাভ করেন আগামেমনন্। শক্ত প্রতিপক্ষ ট্রয়কে ট্রয় যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয়ী বীর হিসেবে দেশে ফিরেন আগামেমনন্।

কিন্তু দেশে ফেরার পর আগামেমনন অত্যন্ত নিরাপদ জায়গায়, অত্যন্ত কাছের মানুষের হাতে ট্রাজিক মৃত্যুবরণ করেন। গ্রীকবাসীকে এত বড় অর্জন এনে দেয়ার পরও তার এই ট্রাজিক পরিণতি সাধারন মানুষকে ছুঁয়ে যাবেই।

পাকিস্তানের সাথে মুজিবের ২৪ বছরের সংগ্রামশীল জীবনটা অনেকটা গ্রীক বীর ওডেসিয়াসের মত। হোমারের মহাকাব্য ওডেসিতে আমরা এই গ্রীক বীরের সংগ্রামী সমুদ্র ভ্রমণের বর্ণনা পাই। উত্তাল সমুদ্রে প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সব সহযোগীদেরকে হারিয়ে নিজ দেশে এসেছিলেন ২০ বছর পর। এজন্য কারও সংগ্রামশীল জীবন বুঝাতে পাশ্চাত্যে ‘ওডেসিয়ান জার্নি’ ঢ়যৎধংব টি ব্যবহার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর নাতিদীর্ঘ জীবনকে আমরা অধ্যয়ন করলে এই শব্দযুগলটি ব্যবহার করতেই হয়। এজন্য মুজিবকে বহুল প্রচলিত গ্রীক ট্রাজেডির নায়কের সাথে যে তুলনা করা হয় তার পেছনে যথেষ্ঠ যুক্তি আছে।

বঙ্গবন্ধুর মাঝে মহাকাব্যিক নায়কের বৈশিষ্ট্য বিরাজমান। বিস্তারিত জানতে ঘুরে আসুন ডিইউআরসি

মুজিব, মুজিব বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলাদের মাঝে কয়জন এই দিনটি মনে রাখেন?

তথ্যসূত্র:

LECTURE GIVEN ON 14 AUGUST AT SENATE BUILDING, DU

  1. AFTER THE DARK NIGHT BY S. M. ALI
  2. MYTHS AND FACTS BANGLADESH LIBERATION WAR BY B.Z. KHASRU
  3. GANGARIDDHI THEKE BANGLADESH BY MUHAMMAD HABIBUR RAHMAN
  4. ERA OF SHEIKH MUJIBUR RAHMAN BY MOUDUD AHMED
  5. BANGLADESH: CONSTITUTIONAL QUEST FOR AUTONOMY BY MOUDUD AHMED
  6. FIFTY YEARS OF POLITICS AS I SAW IT BY ABUL MANSUR AHMAD
  7. JATIYA RAJNITI (1945-75) BY OLI AHAD
  8. NETA JONOTA O RAJNITI BY SERAJUL ISLAM CHOUDHURY
  9. TRIBUTE TO BANGABANDHU BY BANGABANDHU SOCIETY
  10. BANGABANDHU MEMORIAL LECTUERE MODDHORATER SURJOTAPAS BY ABDUL GAFFAR CHOWDHURY
  11. MUJIB HOTTAR SEI RATE BY SHARAFUL ISLAM
  12. THE STATE OF THE NATION BY ABDUR RAZZAQ
  13. JADDAYPI AMAR GURU BY AHMED SOFA
  14. DHAKA BISSHOBIDYALOY O PURBOBANGIYO SOMAJ BY SARDER FAZLUL KARIM