বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। এ দিনটি বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে বাঙ্গালীরা বসবাস করে সেখানেও বাংলা নববর্ষ পালিত হয়। এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বাহক পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন, সর্ববৃহৎ এবং অসাম্প্রদায়িক উৎসবের দিন। অতীতের ভুলক্রটি ও ব্যর্থতার গøানি ভুলে নতুন করে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয় নববর্ষের প্রথম দিন।

দিল্লীর মোঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার বিজ্ঞ রাজ-জ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই মূলত বাংলা সনের উৎপত্তি হয়। তিনি হিজরি চান্দ্র বছরকে সৌরবছরে রূপান্তরপূর্বক বাংলা সন উদ্ভাবন করে ৯৯২ হিজরি সন অনুযায়ী ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাদশা আকবরের কাছে পেশ করেন। এরপর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ বাদশা আকবর এক নির্দেশনামা জারি করে তার সিংহাসনের আরোহণকাল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এর কার্যকারিতা আরোপ করেন। ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাস বাংলা বৈশাখ মাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় তার সাথে মিল রেখে ৯৬৩ বঙ্গাব্দের সূচনা করা হয়। এভাবে বাংলা সনের জন্মলাভ ঘটে। বলা হয়ে থাকে ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এ সন চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে বাঙালি সমাজে বাংলা বর্ষবরণ বেশ সমারোহের সাথে পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব বর্তমানে স্থান করে নিয়েছে জাতীয় উৎসবের তালিকায়।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরুপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর যুক্তফ্রন্ট সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে বাঙ্গালিত্বের চেতনার তীব্র চাপে প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে। এরপর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে রমনার বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মেলা বাংলাদেশের লৌকিক ও জনপ্রিয় উৎসব। এ দেশে মেলার উৎপত্তি হয়েছে মূলত গ্রাম-সংস্কৃতি হতে। বাংলায় নানা ধরনের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান, উৎসব, গৃহে ফসলের আগমন ইত্যাদির সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি হয়েছে। সেদিক দিয়ে দেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও অধিক পুরানো।

পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও মেলা একটি অতি প্রাচীন, অথচ সাধারণ অনুষ্ঠান। প্রসঙ্গত এখানে গ্রীস দেশের থেসালীতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক মেলা এবং আরব দেশের মক্কায় অনুষ্ঠিত উকাজ – এর মেলার উল্লেখ করা যায়। এ দুটো পৃথিবীর প্রাচীনতম মেলাগুলোর অন্যতম। অলিম্পক মেলায় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং উকাজ মেলায় ঘোড়াদৌড় ও সাহিত্য প্রতিযোগিতা প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। ইউরোপে প্রথম আধুনিক শিল্পমেলা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের হাইড পার্কের ক্রিস্টাল প্যালেসে। সবচেয়ে বড় শিল্পমেলা অনুষ্ঠিত হয় ইতালির মিলান আর ফ্রান্সের প্যারিসে। মেলা কখনো কখনো উৎসব হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে। এর প্রমান ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ব্রিটেন উৎসব। মানুষ যখন থেকে অনুভব করল যে পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান প্রয়োজন, মূলত তখন থেকেই বাজার বা ব্যবসা কেন্দ্রের উৎপত্তি। সাধারণ হাট-বাজারগুলোই মানুষকে মেলাকেন্দ্রিক ব্যবসার প্রেরণা যোগায়। মেলা শব্দের সাদাসিদে অর্থ দাঁড়ায় ক্রয়-বিক্রয়ের সমাবেশ। হাট-বাজার যেমন লৌকিক কর্মকান্ডের হাত ধরে কিংবা আপনা থেকেই গড়ে ওঠে অনেকটা তেমনিভাবে মেলার উদ্ভব হয় বলে মনে করা হয়।

এ দেশের হারিয়ে যাওয়া হস্ত ও কারুশিল্প অন্বেষণ, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং কারুশিল্পীদের উৎসাহিত করে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে বিসিক ১৯৬০ সালে ঢাকার মতিঝিলে নকশাকেন্দ্র চালু করে। বিসিক-এর প্রকাশিত কারুপল্লী গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী সত্তরের দশকের শেষ প্রান্তে দেশব্যাপী ৪ হাজার ২২৫ টি কারুপল্লীতে ২৯ ধরনের পণ্য সামগ্রী উৎপাদিত হতো। নকশাকেন্দ্র স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নকশার উন্নয়ন, কারুশিল্পীদের, প্রশিক্ষণ, লোকঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করে কারুপণ্যের যুগোপযোগীকরণসহ দেশে-বিদেশে বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধান উপসর্গ হলো নগরবাসী জনসাধারনের মধ্যে এ সব পণ্যের পরিচয় ঘটানো, দেশে ও বিদেশে প্রদর্শনী ও মেলার ব্যবস্থা করা। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিসিক ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমিতে নগরকেন্দ্রিক বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। বিসিকের তৎকালিন পরিচালক (বিপণন ও নকশা) পটুয়া কামরুল হাসান ঢাক বাজিয়ে শহরের যান্ত্রিকতার মাঝে গ্রামীণ আবহ সৃষ্টি করে পল্লীর মেলাকে নাগরিক জীবনে প্রবেশ ঘটান। তারপর থেকে বিভিন্ন বছর হস্ত, কারু, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়নে সরকারের মূখ্য প্রতিষ্ঠান বিসিক কখনো ঢাকার ধানমন্ডি ক্লাব মাঠে, শেরেবাংলানগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা মাঠে, আজিমপুর গার্লস হাই স্কুল, শিশু একাডেমি চত্বরে বৈশাখী মেলা আয়োজন করছে। তাছাড়া বিসিক এক এক বছর এক এক বিভাগীয় ও জেলা শহরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করছে। যাতে বৈশাখী মেলার আবহ দেশের সর্বত্র বিরাজমান থাকে। এ বছরও বিসিক ঢাকার বাংলা একাডেমি চত্বরে বাংলা একাডেমির সাথে যৌথভাবে এবং গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় জেলা প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে বৈশাখী মেলার আয়োজন করছে। ১৯৮২ সাল থেকে বিসিক ঢাকায় আয়োজিত বৈশাখী মেলায় কারুপণ্য নির্মাতাদের দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে তাদের কাজে উৎসাহ সৃষ্টির জন্যে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পুরস্কার প্রদান শুরু করে। বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক এ পুরস্কারের আর্থিক মূল্য যাই হোক-এ স্বীকৃতি কারুশিল্পীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সঞ্চার করে।

গ্রামে-গঞ্জে কৃষক, কামার, কুমার, তাঁতি, কারু এবং শিল্পী-কারিগরেরা যে সব সামগ্রী তৈরি করে, বৈশাখী মেলায় তা প্রদর্শন ও বিক্রি করার সুযোগ এনে দেয়। গ্রামীণ কৃষিজাত পণ্য, মিষ্টান্ন দ্রব্য, হস্ত ও কুটির শিল্পজাত পণ্য, মাটি ও বেতের তৈরি শিল্প সামগ্রী প্রভৃতি নিয়ে উৎপাদকেরা দোকান সাজায় এ মেলায়। বাঁশ ও তালপাতার রঙ্গিন বাঁশি, ভেঁপু, একতারা, দোতারা, ডুগডুগি, বেলুন, লাটিম, মার্বেল, ঘুড়ি-লাটাই, চরকি, পুতুল, মাটির ঘোড়া, কাঠের ঘোড়া, কাঠ, কাগজ ও বাঁশের পাখি, মাটির হাড়ি-বাসন, কলস, কাচের চুড়ি, পুঁতির মালা ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বসে ছোট ছোট দোকানিরা। এ ছাড়া আছে কাঠের আসবাবপত্র, খাট ,পালঙ্ক, চৌকি, চেয়ার-টেবিল, আলনা, আলমারি, ঢেঁকি, পিঁড়ি, গাড়ির চাকা প্রভৃতি। মেলায় আরও পাওয়া যায় পিতলের হাড়ি, কলস, বাসন- কোসন, লাঙ্গল-জোয়াল, লোহার দা , বটি, কুড়–ল, খন্তা, কাচি, নিড়ানি,গরুর গলার ঘুঙুর। ময়রারা তৈরি করে নানা রকমের মিষ্টান্ন দ্রব্য-কদমা, জিলিপি, বাতাসা, খাজা, ছাঁচের মিঠাই, দিল্লীর লাড্ডু, মটরভাজা, তিলের খাজা, খাগড়াই আরো অনেক কিছু । এই মেলাতে তাঁতীরা নিয়ে আসে নক্সীপাড়ের শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি, গামছা, বিছানার চাদর প্রভৃতি। মেলার একপাশে ছেলেমেয়েদের জন্য তৈরি জামা-কাপড়ও পাওয়া যায়। স্যাকরার দোকানে মেয়েরা ভীড় জমায় রুপা, তামা ও পিতলের গহনা কিনতে। তাছাড়া মেলায় নাগরদোলা, পুতুলনাচ, জাদু, সার্কস,যাত্রা, বায়োস্কোপ, লাঠিখেলা, কুস্তি, হা-ডু- ডু, ঘুড়ি ওড়ানো, ষাঁড়ের লড়াই , ঘোরদৌড়, মোরগের লড়াই, বানরের খেলা ইত্যাদি সনাতন খেলা মানুষকে আনন্দ দিয়ে থাকে। মেলায় প্রতিদিন বাউল, ফকির বা কবিগান, লোকগান, লালনসংগীত, পালাগান, যাত্রা, গম্ভীরা, জারিগান, হাসনরাজার গানের আসর বসে। তাছাড়া মেলার আয়োজনকে মাতিয়ে রাখে সঙ-কৌতুকের দল, তারা স্বাধীনভাবে মেলায় ঘুরে ঘুরে রঙ্গ করে থাকে। বৈশাখী মেলা একদিন, তিনদিন ,সাতদিন, পক্ষকাল, আবার কোথাও পুরো বৈশাখ মাসব্যাপী চলে।

যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মেলার যে রীতি ও ধরণ আমাদের দেশে চালু রয়েছে, বৈশাখী মেলা তার সবটাই ধারণ করে আছে। যেমন- ১। বহু মানুষের সমাবেশ, ২। গানবাজনাসহ চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা, ৩। গ্রামীণ ব্যবহারিক শিল্প সামগ্রীর প্রদর্শনী ও বিক্রয়, ৪। বিভিন্ন রকমের খেলনার আয়োজন। বৈশাখী মেলায় হস্ত, কারু, কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাগণ অর্থাৎ গ্রাম বাংলার কৃষক তাদের পণ্য বিক্রয় ও পরিচিতির সুযোগ পেয়ে লাভবান হচ্ছে। পণ্যের প্রকৃত উৎপাদক বা কারিগরের সঙ্গে ক্রেতাদর্শকের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয় মেলায় এসে। বেচা-কেনার উৎসাহও এর ফলে অনেক বৃদ্ধি পায়। মেলার মাধ্যমে শহরের কিছু কিছু দোকানী বা সংস্থার সাথে গ্রামীণ বিক্রেতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। আবিস্কৃত হয় নানা অজানা কারুশিল্প, নকশা, যে সব কারুশিল্প বা নকশা শহরে এলে আরো সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করা যেতে পারে এবং এ ভাবেই বিসিক প্রবর্তিত শহরে বৈশাখী মেলা আয়োজনের ফলে নগর জীবন ও গ্রামীণ জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্দন সৃষ্টি করে দিয়েছে। লোক সংস্কৃতি ও কৃষি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। মেলার ফলে অনেক অবলুপ্ত বা বিস্তৃতপ্রায় শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। বিসিক কর্তৃক নগরে বৈশাখী মেলা সম্পসারণের ফলে বিদেশীরাও আমাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে, হস্ত, কারু ও কুটির শিল্প সামগ্রীর রফতানি বাড়ছে।

দেশের লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে সব মানুষকে একত্রিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে যশোরে চারুপীঠ নামের একটি সংগঠন প্রথমবারের মতো বর্ষবরণ করতে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। নান্দনিক এ শোভাযাত্রা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ শোভাযাত্রার উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম, শিল্পী হিরন্ময় চন্দ্র,গোলাম দস্তগীর প্রমুখ। যশোরের সেই শোভাযাত্রার পর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে এ আনন্দ শোভাযাত্রাই মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে বৈশাখী মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও আয়োজিত হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম, বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ রং বেরংয়ের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি (পাপেট, ঘোড়া, হাতি) বহন করা হয়।

অবশেষে বলতেই হয়, গ্রামবাঙলার লোকজীবনের সঙ্গে বৈশাখী মেলার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর। এই মেলাগুলোতেই লোকসংস্কৃতি ও কৃষি সংস্কৃতি বিকাশের ধারা বিপুলভাবে লক্ষ করা যায়। এটি আমাদের উৎস-ভ‚মির সন্ধান দেয়। মূলত ও প্রধানত আমাদের জাতিসত্তা বিকাশের জন্য এবং এর শেকড় অনুসন্ধানের জন্য বৈশাখী মেলার প্রয়োজন আজ সর্বাধিক, এ কথা ভেবেই বিসিক গ্রামীণ মেলাকে নিয়ে এসেছে শহরের জীবনধারায়।

বিসিক দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিকাশ ও সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি মুখ্য প্রতিষ্ঠান। সংস্কৃতি ও বিনোদনমূলক কর্মকান্ড বিকাশ বা সম্প্রসারণের দায়িত্ব মোটেই বিসিকের নয়। কাজেই বিসিক এই বৈশাখী মেলার সঙ্গে কি ভাবে জড়িয়ে পড়লো এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

বিসিকের কর্মকান্ডের মধ্যে হস্ত ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার অন্যতম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বিসিক সারা দেশের কুটির/হস্ত শিল্প এবং লোক শিল্পের সার্বিক চিত্র খুঁজে বের করার জন্য সমীক্ষা পরিচালনা করে থাকে। এই সব শিল্প এবং শিল্পের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর কল্যাণের প্রয়োজনে বিসিক বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক সুবিধা প্রদান করছে। এই সব সুবিধার মধ্যে উদ্যোক্তা চিহ্নিতকরণ, কারুপল্লী চিহ্নিতকরণ,কারুশিল্প বা কারুপল্লী উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত হাতিয়ারের ব্যবস্থাকরণ, পণ্যের গুণগতমান উন্নয়নে সহযোগিতা প্রদান, কারুশিল্পের নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে কিন্তু উৎপাদনে একান্ত আবশ্যক সুবিধাদির ব্যবস্থাকরণ,সুবিধা কেন্দ্রের মাধ্যমে সহজ শর্তে সুবিধাদি নিশ্চিতকরণ, পণ্য চাহিদা বা ক্রেতার রুচি মাফিক উন্নতমানের নকশা ও নমুনা সরবরাহকরণ, উন্নত নকশা বা নমুনা ব্যবহারে সহায়তার লক্ষ্যে কারিগরদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান, বিনিয়োগ মূলধনের ব্যবস্থাকরণ, বিপণন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে দ্রব্য সামগ্রী অপরিচিত এলাকার ক্রেতাদের সঙ্গে পরিচিতকরণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থাকরণ এবং আমাদের দেশের হস্ত/কারু ও লোকশিল্প উৎপাদ বিশ্ব দরবারে পরিচিত এবং এর চাহিদা বৃদ্ধিকরণ, এর পাশাপাশি এ সব পণ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিক্রয় করে বৈদেশিক অর্থ উপার্জন অন্যতম।

কাজেই পল্লী মেলা বা শিল্প মেলা, যা আধুনিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠার পূর্বে বিক্রয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে গণ্য হতো, তার সঙ্গে বিসিকের সম্পর্ক অতিশয় সুস্পষ্ট। পল্লী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, মননশীলতা, প্রকৃতি ও ব্যাপ্তির পরিচয় মিলে এই মেলায়। গ্রামীণ কারুশিল্পী/ হস্তশিল্পী বা লোকশিল্পীদের মৌলিক সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার পরিস্ফুটন ঘটে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্যের মাধ্যমে। গ্রামীণ প্রত্যেকটি মেলা এই সব সৃজনশীল ও সৃষ্টিধর্মী কারুকর্মেরই সমাহার। এই খাতের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে বিসিক গ্রামীণ শিল্প প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের। ঐতিহ্যবাহী ও অনৈতিহ্যবাহী কারুশিল্পের পুনরুজ্জীবন ও বিকাশ, কারুপণ্যের মান উন্নয়ন, ক্রেতা সাধারণের রুচি ও চাহিদা সম্মত করার লক্ষ্যে উৎপাদ উন্নয়ন ও উন্নতমানের হাতিয়ার ব্যবহারের একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর পাশাপশি এই সব কারু ও হস্তশিল্পদেরকে উন্নতমানের নকশা ও নমুনা সরবরাহের জন্য এবং তাদের নকশা ব্যবহারে পারদর্শী করার লক্ষ্যে বিসিক নকশা কেন্দ্র বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অন্যদিকে আমাদের দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক আমাদের কারুশিল্প পণ্য। এই পণ্যের চাহিদা দেশে ও বিদেশে বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিসিক হস্তশিল্প বিপণন সংস্থা নামে একটি বিপণন সংস্থা গঠন করেছে। এ ছাড়া বিসিকের সম্প্রসারণ কর্মকর্তাগণ নিয়মিতভাবে এ দেশের হস্ত ও কারুলিল্পীদেরকে বিভিন্ন ধরনের সম্প্রসারণমূলক সুবিধা দিচ্ছে। আর শিল্পের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে তাদের জন্য দেশী ও বিদেশী সংস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ মূলধনেরও ব্যবস্থা করছে। কাজেই এ শিল্পখাতের প্রতি বিসিকের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা খুবই স্বাভাবিক, আর বাঞ্চিতও বটে।

বৈশাখী মেলা আয়োজনে বিসিকের চিন্তাধারা ছিল মূলতঃ এ রকমঃ

-কারু/ হস্তশিল্প পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা সৃষ্টি;
-গ্রামীণ কারু-পণ্য শহুরে জনগোষ্ঠী ও বিদেশীদের সামনে তুলে ধরা ও পরিচিত করা;
-বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পীদের মধ্যে মত বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা;
-কারুশিল্পীদের নতুন নকশা/নমুনার সঙ্গে পরিচিত করা; এবং
-ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদকদের জ্ঞাত করা।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে বিসিক সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৩৫৮ সালে নকশা কেন্দ্র ও ‘সমকালের’সহযোগিতা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। তারপর থেকে প্রতি বছরই বিসিক নিয়মিতভাবে নকশা কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলা একাডেমী/শিল্পকলা একাডেমী/বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সহযোগিতায় সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা উদযাপন করে আসছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হস্ত/কারু শিল্পীগণ এই মেলায় অংশ নেন। মেলায় বিসিক দেশের শ্রেষ্ঠ ও প্রতিভাবান কারূশিল্পীদেরকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার প্রদান করে থাকে। এ পুরস্কার প্রদান পদ্ধতি চালু হয় ১৩৮৯ সালে। শিল্পী তাঁর শিল্প কর্মের মাধ্যমে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে পণ্যের ভিতর দিয়ে ধারণ করছে, তার খবর কেউ রাখে না; যদিও আমরা বড় গলায় দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে নিয়ে গর্ব করি। গ্রামীণ এলাকার শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পীদেরকে বিসিক খুঁজে বের করছে এবং প্রতি বছর এদেরকে পুরস্কৃত করছে। পুরস্কারের মূল্য নগন্য হলেও এই ধরনের স্বীকৃতি শিল্পীদেরকে করে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত। অন্যদিকে এই ধরনের পুরুস্কার ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীকে সৃজনশীল কাজে আরো মনোনিবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করছে।